দ্বিতীয় ভাগ · সমস্যা ও উদ্বেগ বুঝুন
অধ্যায় ৬
সিহর বা জাদু
কুরআনে সিহরের আলোচনা, বাস্তবতা ও সীমা, এবং প্রতিটি সমস্যাকে জাদু মনে না করার ভারসাম্য।
১৪টি প্রশ্নপ্রায় ৯ মিনিটের পড়া
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
কোনো পরিবারে হঠাৎ অশান্তি শুরু হলো। ব্যবসায় ক্ষতি হলো। একজন দীর্ঘদিন অসুস্থ। কারও ঘুম নষ্ট হয়ে গেল। তখন খুব দ্রুত একটি কথা শোনা যায়, “জাদু করা হয়েছে।”
কখনো কথাটি সত্য হতে পারে, আবার অনেক সময় সেটি শুধু ভয়, অনুমান বা ভুল ব্যাখ্যা।
এই অধ্যায়ের কাজ জাদুকে অস্বীকার করা নয়। আবার জীবনের প্রতিটি জটিলতার পেছনে জাদু খোঁজাও নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ যতটুকু নিশ্চিতভাবে বলে, ততটুকু বলা; আর যেখানে আমরা জানি না, সেখানে অনুমান না করা।
একটি নীতি শুরুতেই মনে রাখুন:
সিহরের অস্তিত্ব প্রমাণিত। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার কারণ সিহর, এটি আলাদা দাবি এবং তার জন্য আলাদা প্রমাণ দরকার।
১. সিহর বা জাদু কি সত্য?
হ্যাঁ। কুরআন ও সহিহ হাদিসে সিহরের উল্লেখ আছে।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারায় এমন জাদুর কথা বলেছেন, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর চেষ্টা করা হতো। একই আয়াতেই আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া তারা কাউকে ক্ষতি করতে পারে না:
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيْنَ ٱلْمَرْءِ وَزَوْجِهِۦ ۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ ٱللَّهِ
“তারা তাদের কাছ থেকে এমন বিষয় শিখত, যার দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়। অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারও ক্ষতি করতে পারে না।”এই একই আয়াতে বাবিলের হারুত ও মারুতের প্রসঙ্গও এসেছে। তবে তাদের নিয়ে প্রচলিত অতিরিক্ত কাহিনি নয়, আয়াতের নিশ্চিত বক্তব্যই আমাদের ভিত্তি হবে। এ বিষয়ে সেকশন ১০-এ সংক্ষেপে আলোচনা আসবে।
এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার:
- সিহরের বাস্তবতা কুরআনে এসেছে।
- এর দ্বারা ক্ষতির চেষ্টা হতে পারে।
- স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও প্রভাবের কথা কুরআনে এসেছে।
- কিন্তু এর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই। ক্ষতি আল্লাহর অনুমতির বাইরে নয়।
তাই জাদুকে এমন শক্তি মনে করা যাবে না, যা আল্লাহর তাকদিরের বাইরে কাজ করে।
২. জাদুর সব রূপ একরকম নয়
বাংলায় “জাদু” শব্দটি অনেক কিছুর জন্য ব্যবহার হয়। কারও কাছে জাদু মানে শয়তানি বা গোপন ক্ষতিকর পদ্ধতি, আবার কারও কাছে মঞ্চে দেখানো হাতসাফাই বা চোখের ধাঁধাও “জাদু”।
কুরআনেও এমন একটি ঘটনার কথা আছে, যেখানে ফিরআউনের জাদুকরেরা মানুষের চোখে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল:
سَحَرُوا۟ أَعْيُنَ ٱلنَّاسِ وَٱسْتَرْهَبُوهُمْ وَجَآءُو بِسِحْرٍ عَظِيمٍ
“তারা মানুষের চোখে জাদু করল, তাদের আতঙ্কিত করল এবং বড় ধরনের জাদু প্রদর্শন করল।”অর্থাৎ “সিহর” শব্দের সব প্রয়োগ একই প্রকৃতির নয়। কোথাও দৃষ্টিভ্রম বা প্রতারণামূলক প্রভাবের দিক আছে, আবার কোথাও কুরআন ক্ষতিকর সিহরের কথা বলেছে।
তাই কোনো মঞ্চ-প্রদর্শন, হাতসাফাই বা কৌশল দেখলেই তাকে গায়েবি শক্তির কাজ বলা ঠিক নয়। আবার শরঈ সিহরের বাস্তবতাকেও শুধু “হাতসাফাই” বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
৩. সিহর গুরুতর হারাম
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, সেগুলো কী?” তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেন, তার মধ্যে ছিল শিরক এবং সিহর বা জাদু।
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৭৬৬।
সুতরাং সিহর কোনো নিরীহ কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি গুরুতর হারাম। এর কিছু রূপে শিরক, কুফরি বাক্য, শয়তানি সাহায্য চাওয়া বা অন্য হারাম কাজ থাকতে পারে।
সিহর শেখা ও চর্চা গুরুতর হারাম। তবে কে কাফির হলো, কে প্রকৃত অর্থে জাদুকর হিসেবে শরঈ হুকুমের আওতায় পড়ল, কিংবা কার ওপর কোন ফিকহি বা বিচারিক হুকুম প্রযোজ্য হবে, এসব সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এগুলো ইলম, দলিল ও ঘটনার বাস্তবতা বিবেচনা করে যোগ্য আলেম ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের বিচার্য বিষয়।
৪. সূরা আল-ফালাকে গিঁটে ফুঁ দেওয়ার অনিষ্ট থেকে আশ্রয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِن شَرِّ ٱلنَّفَّـٰثَـٰتِ فِى ٱلْعُقَدِ
“আর গিঁটে ফুঁদানকারীদের অনিষ্ট থেকে।”প্রাচীন তাফসিরে এই আয়াতকে জাদুর সঙ্গে সম্পর্কিত গিঁটে ফুঁ দেওয়ার অনিষ্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। আয়াতে গিঁটের কথা এসেছে বলে ঘরে কোনো গিঁট, সুতা, চুল বা অচেনা বস্তু পেলেই সেটিকে জাদুর বস্তু বলা যাবে না। একটি সাধারণ বস্তু এবং প্রমাণিত সিহরের উপকরণ, এই দুই জিনিস এক নয়।
৫. নবী ﷺ-এর ওপর সিহরের ঘটনা
আয়িশা (রা.) থেকে সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, লাবীদ ইবন আল-আ‘সাম নামের এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর সিহর করেছিল। এর ফলে কিছু দৈনন্দিন বিষয়ে তাঁর মনে এমন ধারণা হতো যে তিনি কোনো কাজ করেছেন, অথচ করেননি। পরে তিনি আল্লাহর কাছে বারবার দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে দেন এবং শিফা দান করেন।
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৬৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৯। (Sunnah.com numbering-এ এই বর্ণনার বিস্তারিত রূপ 2189a, Book 39, Hadith 57.)
এই হাদিস নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই প্রভাব নবুয়ত, ওহি পৌঁছানো বা দ্বীনের সত্যতা নষ্ট করেনি। হাফিজ ইবন হাজর (রহ.) ‘ফাতহুল বারি’-তে কাজি ইয়াজ (রহ.)-এর বক্তব্য উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেন, সিহরের প্রভাব তাঁর দেহ ও বাহ্যিক কিছু অবস্থায় ছিল, তাঁর আকিদা, বোধশক্তি বা ওহি পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্যতায় নয়।
অর্থাৎ এই ঘটনা সিহরের বাস্তবতার প্রমাণ, কিন্তু নবী ﷺ-এর রিসালাতের নির্ভুলতার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নয়।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়: এই ঘটনায় কে সিহর করেছে, কী ব্যবহার হয়েছে এবং কোথায় রাখা হয়েছে, তা নবী ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে জানতে পেরেছিলেন। এখান থেকে সাধারণ মানুষের জন্য এমন কোনো নিয়ম তৈরি হয় না যে স্বপ্ন, রাকি, তথাকথিত জিন বা অনুমানের মাধ্যমে সিহরকারী ও সিহরের বস্তু নিশ্চিতভাবে জানা যায়।
৬. প্রতিটি দাম্পত্য সমস্যা কি সিহর?
না।
সূরা আল-বাকারা ২:১০২-এ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর উদ্দেশ্যে সিহরের কথা এসেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হলেই সিহর হয়েছে।
দাম্পত্য সমস্যার পেছনে থাকতে পারে:
- ভুল বোঝাবুঝি
- রাগ ও যোগাযোগের সমস্যা
- আর্থিক চাপ
- পরিবারের হস্তক্ষেপ
- অবিশ্বাস
- শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা
- দীর্ঘদিনের সম্পর্কগত ক্ষত
এসব বাস্তব কারণ না দেখে সরাসরি “কেউ জাদু করেছে” বললে প্রকৃত সমস্যার সমাধান দেরি হতে পারে।
সিহরের সম্ভাবনা ইসলামে অস্বীকার করা হবে না, কিন্তু দাম্পত্য দ্বন্দ্ব নিজে সিহরের প্রমাণ নয়।
৭. জাদুর কোনো নিশ্চিত লক্ষণ-তালিকা আছে কি?
সহিহ কুরআন-সুন্নাহ এমন কোনো সর্বজনীন তালিকা দেয়নি, যেখানে পাঁচটি বা দশটি লক্ষণ মিললেই বলা যাবে, “আপনার জাদু হয়েছে।”
কিছু রুকইয়াহ গ্রন্থ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক আলোচনায় সম্পর্কের সংকট, ব্যাখ্যা না পাওয়া কষ্ট অথবা রুকইয়াহর সময় প্রতিক্রিয়ার মতো অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়। এগুলোর জাদু শনাক্ত করার প্রমাণিত ক্ষমতা নেই। একই অভিজ্ঞতার শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও অন্য বাস্তব ব্যাখ্যা থাকতে পারে। সমস্যার বিবরণ শুনুন, কিন্তু তা থেকে অদৃশ্য কারণ নিশ্চিত করবেন না।
একই ধরনের সমস্যা সম্পর্কগত দ্বন্দ্ব, পারিবারিক নির্যাতন বা চাপ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগ, যৌন বা অন্যান্য চিকিৎসাগত সমস্যা, আর্থিক চাপ, ঘুমের সমস্যা কিংবা অন্য বাস্তব কারণেও হতে পারে।
এসব অভিজ্ঞতা থাকলে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করা যায়। পাশাপাশি শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও বাস্তব কারণও মূল্যায়ন করুন।
কুরআন আমাদের সিহরের বাস্তবতা শেখায়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ওপর সিহর হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সাধারণ উপসর্গের নির্ভুল তালিকা দেয় না।
৮. রুকইয়াহর সময় প্রতিক্রিয়া কি জাদুর প্রমাণ?
না।
রুকইয়াহর সময় কান্না, কাঁপুনি, ঘুম, শরীর গরম লাগা, মাথা ভার বা অস্বস্তির মতো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু এগুলো একা সিহরের প্রমাণ নয়। ভয়, প্রত্যাশা, শারীরিক ক্লান্তি, উদ্বেগ, ব্যথা বা অন্য কারণেও এমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
তাই এসবকে শুধু পর্যবেক্ষণ হিসেবে নোট করুন; কারণ নিশ্চিত করার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
৯. স্বপ্নে কেউ নাম বললে কি সে-ই জাদুকর?
না।
স্বপ্ন, “মনে হচ্ছে”, কোনো রাকির অনুমান বা রুকইয়াহর সময় কারও মুখে উচ্চারিত একটি নাম, এগুলোর কোনোটিকেই একা শরঈ প্রমাণ বানানো যাবে না।
একজন নির্দোষ আত্মীয়কে সন্দেহ করতে করতে পরিবার ভেঙে যেতে পারে। জাদু থেকে বাঁচতে গিয়ে যদি অন্যায় সন্দেহ, অপবাদ ও সম্পর্কচ্ছেদ শুরু হয়, তাহলে নতুন একটি বড় ক্ষতি তৈরি হয়।
তাই “কে করেছে?” প্রশ্নের চেয়ে “আমি এখন শরিয়তসম্মতভাবে কী করব?” প্রশ্নটি বেশি উপকারী।
১০. হারুত-মারুত নিয়ে লোককথায় হারিয়ে যাবেন না
সূরা আল-বাকারা ২:১০২-এ হারুত ও মারুতের উল্লেখ আছে। কিন্তু তাদের ঘিরে প্রচলিত বহু অতিরিক্ত কাহিনির নির্ভরযোগ্য সহিহ প্রমাণ নেই। তাই এই বইয়ে আয়াতের নিশ্চিত বক্তব্যের বাইরে লোককথা বা যাচাইহীন বর্ণনা দিয়ে সিহরের ধারণা তৈরি করা হবে না।
এখানে মূল শিক্ষা হলো: সিহর শেখা ও চর্চা নিন্দিত ও ক্ষতিকর, আর কোনো ক্ষতিই আল্লাহর অনুমতির বাইরে নয়।
১১. জাদু সন্দেহ হলে প্রথমে কী করবেন?
প্রথম কাজ আতঙ্কিত হওয়া নয়। দ্বিতীয় কাজ “কে করেছে” খোঁজা নয়। তৃতীয় কাজ কোনো কবিরাজ, ওঝা বা গোপন মন্ত্রের মানুষের কাছে দৌড়ানোও নয়।
বরং আপনি:
- আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন।
- নিজের জন্য শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করবেন।
- কুরআন ও প্রামাণিক দোয়া পড়বেন।
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকর নিয়মিত করবেন।
- প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চললে তা বন্ধ করবেন না।
- দাম্পত্য, মানসিক, আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যা হলে তার বাস্তব কারণও সমাধানের চেষ্টা করবেন।
নিজের জন্য রুকইয়াহর প্রস্তুতি, শুরু করার পদ্ধতি ও দৈনিক রুটিন তৃতীয় ভাগে, বিশেষ করে অধ্যায় ১৩-১৫-এ আসবে। নির্বাচিত আয়াত ও দোয়া আলাদা অধ্যায়ে থাকবে।
১২. জাদু কাটানোর নামে আরেক হারামে যাবেন না
ভয় পাওয়া মানুষকে সবচেয়ে সহজে প্রতারণা করা যায়। কেউ বলতে পারে:
“জাদু কাটাতে আরেক জাদু লাগবে।”
“জিনের সাহায্য ছাড়া এটি বের করা যাবে না।”
“এই অজানা লেখা বা তাবিজ রাখতে হবে।”
“আমাকে গোপন নাম, মায়ের নাম বা বিশেষ বস্তু দিতে হবে।”
“কাউকে বলবেন না, এটি গোপন চিকিৎসা।”
এ ধরনের কথায় সতর্ক হোন।
হারাম বা শিরকি পদ্ধতি দিয়ে শরিয়তসম্মত চিকিৎসা হয় না। সিহর থেকে বাঁচার নামে এমন পথে যাওয়া যাবে না, যেখানে অজানা মন্ত্র, জিনের সাহায্য, গায়েব জানার দাবি বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়।
তাবিজ, কবচ, কবিরাজ, ওঝা ও সন্দেহজনক পদ্ধতি নিয়ে অধ্যায় ২৩-এ বিস্তারিত আলোচনা হবে।
১৩. কোনো অচেনা বস্তু পেলেই “জাদুর বস্তু” বলবেন না
চুল, সুতা, গিঁট, কাগজ, পুঁতি, মাটি বা অন্য কোনো অচেনা জিনিস দেখে অনেকের ভয় হয়।
কিন্তু অচেনা বস্তু পাওয়া মানেই সিহর পাওয়া নয়।
কোনো বস্তুতে স্পষ্ট অশ্লীল, শিরকি বা অজানা সাংকেতিক লেখা থাকলে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে। কিন্তু সেটির উৎস ও উদ্দেশ্য না জেনে নিশ্চিতভাবে “এটাই আমার জাদু” বলা ঠিক নয়।
অজানা রাসায়নিক, ধারালো বস্তু বা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কিছু হলে খালি হাতে না ধরাই নিরাপদ। ধর্মীয় দিক সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে দায়িত্বশীল আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
মূল লক্ষ্য হবে ভয় বাড়ানো নয়, নিরাপদ থাকা।
১৪. সিহর নিয়ে ছয়টি ভারসাম্য
১. সিহর সত্য, কিন্তু প্রতিটি সমস্যা সিহর নয়।
২. সিহর ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর অনুমতির বাইরে কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই।
৩. কুরআনে দাম্পত্য বিচ্ছেদের সঙ্গে সিহরের উল্লেখ আছে, কিন্তু প্রতিটি দাম্পত্য সমস্যা সিহরের প্রমাণ নয়।
৪. নবী ﷺ-এর ওপর সিহরের ঘটনা সহিহ, কিন্তু তা ওহি বা রিসালাতের নির্ভুলতাকে প্রভাবিত করেনি।
৫. রুকইয়াহ করা বৈধ, কিন্তু রুকইয়াহর প্রতিক্রিয়া দিয়ে সিহর নিশ্চিত করা যায় না।
৬. সিহর থেকে বাঁচতে গিয়ে শিরক, অজানা মন্ত্র, প্রতারণা বা অন্যায় সন্দেহে জড়ানো যাবে না।
মূল কথা
- সিহরের বাস্তবতা কুরআন ও সহিহ হাদিসে প্রমাণিত।
- সিহরের কোনো স্বাধীন শক্তি নেই; সবকিছু আল্লাহর অনুমতি ও তাকদিরের অধীন।
- জাদু বা সিহর গুরুতর হারাম এবং কিছু রূপে কুফরি ও শিরকি কাজ থাকতে পারে।
- সাধারণ উপসর্গ বা পারিবারিক সমস্যাকে একা সিহরের প্রমাণ বানানো যাবে না।
- সন্দেহ হলে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করুন, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও বাস্তব সমাধানও চালিয়ে যান।
- “কে করেছে?” খোঁজার চেয়ে নিজের ঈমান, আমল, নিরাপত্তা ও করণীয় ঠিক করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বাক্য মনে রাখুন:
সিহরকে অস্বীকার করবেন না, আবার সিহরের নামে অনুমান, ভয় ও প্রতারণাকেও সত্য বানাবেন না।
পরের অধ্যায়ে
সিহরের পর আরেকটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয়, গল্প ও ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে: জিন।
জিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে কুরআন কী বলে?
মানুষের জীবনে জিনের প্রভাব নিয়ে কতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়?
কোন অভিজ্ঞতাকে জিনের নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না?
আর জিনের ভয় যেন মানুষের স্বাভাবিক জীবন, চিকিৎসা ও ঈমানের ভারসাম্য নষ্ট না করে, সেটি কীভাবে বুঝব?
পরের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব:
অধ্যায় ৭: জিন-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও ভুল ধারণা
জিন-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও ভুল ধারণাএখন কী করবেন?
অভিজ্ঞতার বর্ণনাকে রোগনির্ণয়ের তালিকা বানাবেন না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কী, তা প্রশ্ন করুন। নিজের জন্য বৈধ দোয়া পড়ুন এবং দৃশ্যমান সমস্যার সাহায্য নিন।
তথ্যসূত্র
১. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১০২।
২. আল-কুরআন, সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১১৬।
৩. আল-কুরআন, সূরা আল-ফালাক, ১১৩:৪।
৪. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৭৬৬, সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহর মধ্যে সিহর।
৫. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৬৩, আয়িশা (রা.) থেকে নবী ﷺ-এর ওপর সিহরের ঘটনা।
৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৯, একই ঘটনার বর্ণনা।
৭. ইবন হাজর আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, কিতাবুত তিব্ব, বাবুস সিহর; কাজি ইয়াজ (রহ.)-এর ব্যাখ্যা উদ্ধৃত।
পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?
রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।