দ্বিতীয় ভাগ · সমস্যা ও উদ্বেগ বুঝুন
অধ্যায় ৯
ভয়, উদ্বেগ, প্যানিক ও মন খারাপ
ভয় ও প্যানিককে শুধু আধ্যাত্মিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সহায়তার পথ।
১৫টি প্রশ্নপ্রায় ৯ মিনিটের পড়া
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
হঠাৎ বুক ধড়ফড় শুরু হলো। মনে হচ্ছে শ্বাস ঠিকমতো নিতে পারছেন না। হাত কাঁপছে। মাথা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, “আমি কি মারা যাচ্ছি?”
আবার কারও কয়েক সপ্তাহ ধরে কিছুই ভালো লাগছে না। ঘুম এলোমেলো, কাজে মন বসছে না, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কেউ বললেন, “জিনের সমস্যা।” কেউ বললেন, “ঈমান দুর্বল।”
কিন্তু ভয়, উদ্বেগ, প্যানিক ও মন খারাপ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এগুলোর কিছু স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া, আবার কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসাযোগ্য মানসিক-স্বাস্থ্য সমস্যার অংশ হতে পারে।
এই অধ্যায়ের লক্ষ্য তিনটি ভারসাম্য ধরে রাখা:
আল্লাহর কাছে আশ্রয়, দোয়া, যিকর ও রুকইয়াহকে অবহেলা করব না।
ভয় বা মন খারাপকে ঈমানহীনতার প্রমাণ বলব না।
আর বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, কাঁপুনি বা মৃত্যুভয়কে একা জিন, সিহর বা বদনজরের নিশ্চিত প্রমাণও বানাব না।
১. ভয় ও মন খারাপ কি সবসময় রোগ?
না।
ভয়, দুশ্চিন্তা, শোক ও মন খারাপ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। বিপদ, পরীক্ষা, অসুস্থতা, আর্থিক চাপ, সম্পর্কের সমস্যা, প্রিয়জন হারানো বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় মানুষ ভয় বা দুঃখ অনুভব করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍۢ مِّنَ ٱلْخَوْفِ وَٱلْجُوعِ وَنَقْصٍۢ مِّنَ ٱلْأَمْوَٰلِ وَٱلْأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِ ۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّـٰبِرِينَ
“তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব; আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”অর্থাৎ ভয় অনুভব করলেই মানুষের ঈমান নষ্ট হয়ে যায় না। বরং ভয় ও কষ্টের মধ্যেও কীভাবে আল্লাহর দিকে ফিরবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
২. ইসলাম উদ্বেগ ও দুঃখকে অস্বীকার করে না
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত একটি দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ, অক্ষমতা ও অলসতা, ভীরুতা ও কৃপণতা, ঋণের ভার এবং মানুষের চাপে পরাজিত হওয়া থেকে আশ্রয় চাই।”এই দোয়া আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: দুশ্চিন্তা ও দুঃখ এমন বাস্তব কষ্ট, যার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া যায়।
৩. উদ্বেগ কখন সমস্যায় পরিণত হতে পারে?
কিছু দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। পরীক্ষা, চাকরি, পরিবার বা অসুস্থতা নিয়ে চিন্তা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু যখন ভয় ও উদ্বেগ:
- খুব তীব্র হয়,
- নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়,
- দীর্ঘদিন থাকে,
- ঘুম, কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক বা ইবাদত ব্যাহত করে,
- এবং এড়িয়ে চলার কারণে স্বাভাবিক জীবন ছোট হয়ে আসে,
তখন সেটি উদ্বেগজনিত মানসিক-স্বাস্থ্য সমস্যার অংশ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বেগজনিত সমস্যায় অতিরিক্ত ভয় ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে বুক ধড়ফড়, ঘাম, কাঁপুনি, ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা এবং বিপদ আসছে এমন অনুভূতির কথাও উল্লেখ করে।
এ ধরনের লক্ষণ থাকলেই নিজে নিজে রোগনির্ণয় করবেন না। প্রয়োজন হলে যোগ্য চিকিৎসক বা মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন নিন।
৪. প্যানিক অ্যাটাক কী?
প্যানিক অ্যাটাক হলো হঠাৎ তীব্র ভয় বা অস্বস্তির একটি ঢেউ, যা কখনো স্পষ্ট বিপদ ছাড়াও শুরু হতে পারে।
এ সময় হতে পারে:
- বুক খুব দ্রুত ধড়ফড় করা,
- ঘাম,
- কাঁপুনি,
- শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মনে হওয়া,
- মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা,
- বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা,
- বমিভাব,
- শরীর অবশ বা ঝিনঝিন করা,
- নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়,
- অথবা “আমি মারা যাচ্ছি” এমন তীব্র অনুভূতি।
একবার প্যানিক অ্যাটাক হওয়া আর প্যানিক ডিসঅর্ডার এক বিষয় নয়। প্যানিক ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ বারবার আতঙ্কের আক্রমণ এবং আবার আক্রমণ হবে কি না তা নিয়ে স্থায়ী ভয় তৈরি হওয়ার সমস্যা, উদ্বেগজনিত সমস্যার একটি ধরন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্যানিক ডিসঅর্ডারকে প্যানিক অ্যাটাক ও পরবর্তী আক্রমণের ভয় দ্বারা চিহ্নিত উদ্বেগজনিত সমস্যার একটি ধরন হিসেবে উল্লেখ করে।
৫. প্যানিক অ্যাটাক মানেই কি জিন বা জাদু?
না।
প্যানিকের সময় শরীরের অনুভূতিগুলো এত তীব্র হতে পারে যে মানুষ মনে করতে পারেন, তাঁর শরীরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। যদি আগে থেকেই জিন বা জাদু নিয়ে ভয় থাকে, তাহলে তিনি খুব দ্রুত সেই ব্যাখ্যার দিকে চলে যেতে পারেন।
কিন্তু বুক ধড়ফড়, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট, মৃত্যুভয় বা মাথা ঘোরা, এগুলো প্যানিকের পরিচিত লক্ষণও হতে পারে।
তাই:
“বুক ধড়ফড় করেছে, তাই জিন”
অথবা
“রুকইয়াহ শুনে ভয় বেড়েছে, তাই জাদু নিশ্চিত”
এমন সিদ্ধান্ত নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতিতেও মানসিক সমস্যাকে অতিপ্রাকৃত কারণের সঙ্গে যুক্ত করার কুসংস্কারকে চিকিৎসা নেওয়ার একটি বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য আকিদার প্রমাণিত বিষয় অস্বীকার করা নয়; বরং নির্দিষ্ট সমস্যার কারণ নির্ধারণে তাড়াহুড়ো না করা।
৬. প্যানিকের সময় কী করবেন?
প্রথমে সম্ভব হলে নিরাপদ জায়গায় বসুন। নিজের কাছে মনে করিয়ে দিন:
“আমি তীব্র ভয় অনুভব করছি। এখনই কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই।”
তারপর:
- শ্বাস ধীরে করুন। জোর করে খুব গভীর শ্বাস নিতে গিয়ে মাথা আরও হালকা করবেন না।
- সম্ভব হলে ধীরে, স্বাভাবিক ছন্দে শ্বাস নিন এবং ছাড়ুন।
- ঘরের কয়েকটি দৃশ্যমান জিনিসের দিকে মন দিন, পায়ের নিচে মাটি অনুভব করুন।
- ভয় বাড়ায় এমন ভিডিও, লক্ষণ-তালিকা বা ইন্টারনেট অনুসন্ধান সঙ্গে সঙ্গে শুরু করবেন না।
- আল্লাহর যিকর, দোয়া বা পরিচিত কুরআনের আয়াত পড়তে পারেন।
- আক্রমণ বারবার হলে বা জীবন সীমিত হয়ে এলে পেশাদার মূল্যায়ন নিন।
এই কৌশলগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়। এগুলো তীব্র মুহূর্ত পার হতে সহায়তা করতে পারে।
৭. বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ কখনো হার্ট বা অন্য শারীরিক সমস্যার মতো মনে হতে পারে। তাই সব বুকে ব্যথাকে “প্যানিক” ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
বিশেষ করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন যদি:
- নতুন বা তীব্র বুকব্যথা/চাপ হয়,
- ব্যথা বাহু, কাঁধ, চোয়াল, ঘাড় বা পিঠে ছড়িয়ে যায়,
- গুরুতর শ্বাসকষ্ট হয়,
- অজ্ঞান হয়ে যান বা প্রায় অজ্ঞান লাগতে থাকে,
- ঠান্ডা ঘাম, তীব্র দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক অসুস্থতা থাকে,
- অথবা আপনার মনে হয় এটি আগের পরিচিত প্যানিকের মতো নয়।
এ অবস্থায় আগে জরুরি চিকিৎসা নিন। বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে। রুকইয়াহ পড়তে চাইলে পড়তে পারেন, কিন্তু চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না।
৮. “মন খারাপ” আর বিষণ্নতা কি একই জিনিস?
না।
একটি খারাপ দিন, হতাশাজনক খবর বা কোনো ক্ষতির পর মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে।
বিষণ্নতাজনিত ব্যাধি (depressive disorder) সাধারণ মন খারাপের চেয়ে বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিষণ্নতায় সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ, শূন্যতা বা বিরক্তি, অথবা আগের পছন্দের কাজেও আনন্দ বা আগ্রহ কমে যেতে পারে। সঙ্গে থাকতে পারে:
- মনোযোগের সমস্যা,
- অতিরিক্ত অপরাধবোধ বা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া,
- ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীনতা,
- ঘুমের পরিবর্তন,
- ক্ষুধা বা ওজনের পরিবর্তন,
- অতিরিক্ত ক্লান্তি,
- এবং কখনো মৃত্যু বা আত্মহত্যা নিয়ে চিন্তা।
এই ধরনের উপসর্গ বেশিরভাগ দিন, প্রায় প্রতিদিন, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় থাকলে এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করলে পেশাদার মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
৯. বিষণ্নতা বা উদ্বেগ কি দুর্বল ঈমানের প্রমাণ?
না। এভাবে সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়।
একজন মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসতে পারেন, সালাত আদায় করতে পারেন, যিকর করতে পারেন, আবার একই সঙ্গে উদ্বেগ বা বিষণ্নতায়ও কষ্ট পেতে পারেন।
মানসিক কষ্টকে শুধু “ঈমান কম” বলে ব্যাখ্যা করলে মানুষ লজ্জা পেতে পারেন এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন।
আবার মানসিক-স্বাস্থ্য চিকিৎসার প্রয়োজন আছে বলেই দোয়া, কুরআন, তাওয়াক্কুল বা আধ্যাত্মিক আমল অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না।
দুই দিকই একসঙ্গে রাখা যায়।
১০. যিকর ও রুকইয়াহর জায়গা কোথায়?
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ ٱللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ
“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।”কুরআন, দোয়া, যিকর ও রুকইয়াহ একজন মুমিনের জন্য আশ্রয়, ইবাদত ও শিফার মাধ্যম। ভয় বা মন খারাপের সময় এগুলো করা যেতে পারে।
তবে একটি সতর্কতা জরুরি:
যিকর করলে শান্তি পাওয়া মানে এই নয় যে সমস্যাটি অবশ্যই জিনের ছিল।
আবার চিকিৎসা নিলে এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহর ওপর ভরসা কমে গেছে।
রুকইয়াহকে চিকিৎসার প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোর প্রয়োজন নেই।
১১. যে ভুলগুলো করবেন না
- প্যানিক অ্যাটাককে সঙ্গে সঙ্গে জিনের আক্রমণ বলবেন না।
- মন খারাপকে “ঈমান নেই” বলে অপমান করবেন না।
- বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্টকে শুধু মানসিক সমস্যা ভেবে জরুরি চিকিৎসা দেরি করবেন না।
- চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে হঠাৎ বন্ধ করবেন না।
- ভয় বাড়ায় এমন লক্ষণ-তালিকা, ভিডিও বা অনলাইন গল্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকবেন না।
- প্রতিটি আবেগকে “আধ্যাত্মিক রোগের প্রতিক্রিয়া” বানাবেন না।
১২. পরিবারের মানুষ কীভাবে সাহায্য করবেন?
ভয় বা বিষণ্নতায় কষ্ট পাওয়া কাউকে শুধু উপদেশ দিয়ে থামিয়ে দেওয়া সবসময় যথেষ্ট নয়।
বলবেন না:
“এত ভয় পাও কেন?”
“তোমার ঈমান দুর্বল।”
“সব মাথার ভেতর।”
“নিশ্চয়ই জিন করেছে।”
বরং:
- তাঁর কথা শান্তভাবে শুনুন।
- ভয়কে সত্য বলে নিশ্চিত না করেও কষ্টকে গুরুত্ব দিন।
- ঘুম, খাওয়া ও দৈনন্দিন রুটিনে সহায়তা করুন।
- প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে সহযোগিতা করুন।
- সালাত, দোয়া ও যিকরে নরমভাবে উৎসাহ দিন, কিন্তু চাপ সৃষ্টি করবেন না।
- নিজের বা অন্যের ক্ষতির কথা বললে বিষয়টিকে হালকা করবেন না।
১৩. নিজের ক্ষতি বা আত্মহত্যার চিন্তা হলে কী করবেন?
“মরে গেলে ভালো হতো”, “বেঁচে থাকার অর্থ নেই”, নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা বা আত্মহত্যার পরিকল্পনা, এসবকে শুধু মন খারাপ বলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
যদি নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা, পরিকল্পনা, প্রস্তুতি বা তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকে:
- একা থাকবেন না।
- বিশ্বস্ত একজন মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে জানান।
- নিজের কাছে থাকা ক্ষতিকর উপায় বা বস্তু থেকে দূরে যান।
- দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা জরুরি চিকিৎসাসেবায় যান।
- বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতির তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে ব্যক্তিকে একা না রাখা, বিশ্বস্ত সহায়তা নেওয়া এবং জরুরি সেবার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।
এ অবস্থায় শুধু রুকইয়াহ পড়ে অপেক্ষা করা যথেষ্ট নয়। রুকইয়াহ পড়া যেতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসা আগে নিশ্চিত করতে হবে।
১৪. কখন মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত?
নিচের যেকোনোটি থাকলে পেশাদার মূল্যায়ন উপকারী হতে পারে:
- ভয় বা উদ্বেগ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।
- প্যানিক অ্যাটাক বারবার হচ্ছে।
- আবার আক্রমণ হবে এই ভয়ে বাইরে যাওয়া, একা থাকা বা স্বাভাবিক কাজ এড়িয়ে চলছেন।
- মন খারাপ বা আগ্রহহীনতা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে আছে।
- ঘুম, খাওয়া, কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক বা ইবাদত উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
- ভয় বা মন খারাপের কারণে অ্যালকোহল, মাদক বা ক্ষতিকর আচরণের দিকে ঝুঁকছেন।
- নিজের ক্ষতি বা আত্মহত্যার চিন্তা হচ্ছে।
সহায়তা নেওয়া দুর্বলতা নয়; এটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১৫. একটি সহজ করণীয় পরিকল্পনা
১. প্রথমে সমস্যাটিকে নাম দেওয়ার তাড়াহুড়ো করবেন না। “জিন”, “জাদু”, “প্যানিক”, “ডিপ্রেশন”, কোনো লেবেলই যাচাই ছাড়া দেবেন না।
২. শরীরের গুরুতর লক্ষণ থাকলে চিকিৎসা আগে নিন।
৩. ভয় বাড়লে ধীরে শ্বাস নিন, নিরাপদ জায়গায় বসুন, পরিবেশের বাস্তব জিনিসে মন দিন।
৪. সালাত, যিকর, দোয়া ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন।
৫. নিয়মিত ঘুম, খাবার, হালকা শারীরিক চলাফেরা এবং বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুন।
৬. সমস্যা দীর্ঘ হলে বা জীবন ব্যাহত করলে মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
৭. আত্মক্ষতির ঝুঁকি হলে অপেক্ষা নয়, জরুরি সহায়তা নিন।
মনে রাখুন
- ভয় ও মন খারাপ মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাও হতে পারে।
- অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী ভয় চিকিৎসাযোগ্য উদ্বেগজনিত সমস্যার অংশ হতে পারে।
- প্যানিক অ্যাটাকের বুক ধড়ফড়, কাঁপুনি বা মৃত্যুভয় জিনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
- সাধারণ মন খারাপ আর বিষণ্নতা এক বিষয় নয়।
- দোয়া, যিকর ও রুকইয়াহর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা একসঙ্গে চলতে পারে।
- বুকব্যথা, গুরুতর শ্বাসকষ্ট বা আত্মক্ষতির ঝুঁকিতে চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না।
একটি বাক্য মনে রাখুন:
ভয়কে অস্বীকার করবেন না, আবার ভয়কে অদৃশ্য কারণের নিশ্চিত প্রমাণও বানাবেন না।
পরের অধ্যায়ে
ভয় ও উদ্বেগের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক খুব গভীর। আবার রাতে দুঃস্বপ্ন, হঠাৎ জেগে ওঠা, শরীর নড়াতে না পারা বা অস্বস্তিকর অনুভূতিকে মানুষ দ্রুত জিনের সঙ্গে যুক্ত করেন।
কোনটি সাধারণ ঘুমের সমস্যা? দুঃস্বপ্ন হলে কী করবেন? স্লিপ প্যারালাইসিস কী? কখন চিকিৎসা প্রয়োজন?
পরের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব:
অধ্যায় ১০: ঘুম, দুঃস্বপ্ন ও রাতের অস্বস্তি
ঘুম, দুঃস্বপ্ন ও রাতের অস্বস্তিএখন কী করবেন?
ভয়ের সময় নিজের শ্বাস ও পরিবেশে মনোযোগ দিন, কাছের বিশ্বস্ত কাউকে জানান। বারবার প্যানিক বা দীর্ঘ মন খারাপ হলে মূল্যায়নের সময় নিন। জরুরি ঝুঁকিতে অধ্যায় ২৭ দেখুন।
তথ্যসূত্র
১. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫।
২. আল-কুরআন, সূরা আর-রা‘দ, ১৩:২৮।
৩. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৩৬৯।
৪. World Health Organization, Anxiety disorders, Fact Sheet।
৫. World Health Organization, Depressive disorder (depression), Fact Sheet।
৬. World Health Organization, Suicide, Questions and Answers।
৭. Government of the People’s Republic of Bangladesh, National Mental Health Policy, Bangladesh 2022, বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, পৃ. ৯৬৩৮।
৮. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ, সরকারি জরুরি যোগাযোগ তথ্য।
পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?
রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।