মূল বিষয়বস্তুতে যান

নুরুল কালাম একাডেমিতে আপনাকে স্বাগতম

০১৫৭৭৩০১১৬১

দ্বিতীয় ভাগ · সমস্যা ও উদ্বেগ বুঝুন

অধ্যায় ১০

ঘুম, দুঃস্বপ্ন ও রাতের অস্বস্তি

দুঃস্বপ্ন, sleep paralysis ও রাতের অস্বস্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য একাধিক ব্যাখ্যা ও করণীয়।

১৪টি প্রশ্নপ্রায় ৯ মিনিটের পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হলো ঘরে কেউ আছে। আবার কখনো স্বপ্নে এমন কিছু দেখলেন, ঘুম ভাঙার পরও ভয় কাটছে না। কারও আবার চোখ খুলেছে, চারপাশ বুঝতে পারছেন, কিন্তু শরীর নড়াতে পারছেন না। তখন খুব দ্রুত মনে হতে পারে, “এটা কি জিনের কারণে?”

রাতের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দিনের চেয়ে বেশি ভয় তৈরি করতে পারে। কারণ অন্ধকার, নিস্তব্ধতা, আধোঘুম এবং হঠাৎ জেগে ওঠার মুহূর্তে অনুভূতি খুব তীব্র লাগে।

এই অধ্যায়ের লক্ষ্য হলো তিনটি ভারসাম্য ধরে রাখা:

দুঃস্বপ্ন ও শয়তানি কষ্ট সম্পর্কে সুন্নাহর শিক্ষা মানব।

ঘুমের পরিচিত শারীরিক ও মানসিক কারণগুলোও বুঝব।

আর কোনো একটি রাতের অভিজ্ঞতাকে একা জিন, সিহর বা বদনজরের নিশ্চিত প্রমাণ বানাব না।

১. সব স্বপ্ন কি একই ধরনের?

না। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বপ্নকে তিন ধরনের বলে উল্লেখ করেছেন:

  • আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদমূলক ভালো স্বপ্ন।
  • শয়তানের পক্ষ থেকে কষ্টদায়ক স্বপ্ন।
  • মানুষের নিজের মনের কথাবার্তা বা চিন্তার প্রতিফলন।

সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩a (Sunnah.com numbering; Book 42, Hadith 9)।

এই হাদিসটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের শেখায়, প্রতিটি স্বপ্নকে একইভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

কোনো স্বপ্ন ভালো লাগলেই সেটিকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী বলা যাবে না। আবার ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে বাস্তবে জিন, সিহর বা বিপদ নিশ্চিত হয়েছে।

স্বপ্ন কখনো অর্থবহ হতে পারে, আবার কখনো দিনের ভয়, চিন্তা, স্মৃতি বা মানসিক চাপের প্রতিফলনও হতে পারে।

২. দুঃস্বপ্ন দেখলে সুন্নাহ কী শেখায়?

আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং কষ্টদায়ক স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর কাছে তার অনিষ্ট ও শয়তান থেকে আশ্রয় চাইবে, বাম দিকে তিনবার হালকা ফুঁ/থুতুর ভঙ্গি করবে এবং সেটি মানুষের কাছে বলে বেড়াবে না। তাহলে তা তার ক্ষতি করবে না।

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৭০৪৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬১a ও ২২৬১f (Sunnah.com numbering)।

সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় পাশ পরিবর্তন করে শোয়ার কথাও এসেছে। আরেক বর্ণনায় উঠে সালাত আদায়ের কথাও বলা হয়েছে।

সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬২; হাদিস ২২৬৩a (Sunnah.com numbering)।

সহজভাবে দুঃস্বপ্নের পর করণীয়:

১. আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।

২. বাম দিকে তিনবার হালকা ফুঁ/থুতুর ভঙ্গি করুন।

৩. যে পাশে শুয়েছিলেন, পাশ পরিবর্তন করুন।

৪. স্বপ্নটি নিয়ে মানুষের কাছে ব্যাখ্যা খুঁজে বেড়াবেন না।

৫. খুব অস্থির লাগলে উঠে সালাত পড়তে পারেন।

এই সুন্নাহর উদ্দেশ্য ভয়কে বড় করা নয়, বরং ভয় থেকে মানুষকে আল্লাহর আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা।

৩. দুঃস্বপ্ন কি জাদু বা জিনের নিশ্চিত প্রমাণ?

না।

দুঃস্বপ্ন হতে পারে, কিন্তু শুধু দুঃস্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে বলা যাবে না:

“আপনার জাদু হয়েছে।”

“জিন আপনাকে আক্রমণ করছে।”

“অমুক ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করেছে।”

বিশেষ করে কোনো স্বপ্নে পরিচিত ব্যক্তিকে দেখলেই তাকে সন্দেহ করা বিপজ্জনক। স্বপ্ন কারও বিরুদ্ধে শরঈ প্রমাণ নয়।

কেউ বারবার একই ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখলেও প্রথম কাজ হওয়া উচিত ভয় বাড়ানো নয়, বরং পুরো পরিস্থিতি দেখা:

  • ঘুম ঠিক আছে কি না
  • সাম্প্রতিক মানসিক চাপ আছে কি না
  • কোনো ট্রমা বা বড় ঘটনা ঘটেছে কি না
  • নতুন কোনো ওষুধ শুরু হয়েছে কি না
  • উদ্বেগ বা বিষণ্নতা বেড়েছে কি না
  • ঘুমের অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না

পুনরাবৃত্ত দুঃস্বপ্ন কখনো ট্রমা-পরবর্তী মানসিক কষ্টের অংশ হতে পারে, আবার অন্যান্য ঘুম ও মানসিক-স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গেও দেখা যেতে পারে।

সূত্র: World Health Organization, Post-traumatic stress disorder; WHO ICD classification, Nightmares (F51.5)।

৪. একই দুঃস্বপ্ন বারবার হলে কী করবেন?

এক-দুবার দুঃস্বপ্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি বারবার হয়, ঘুমের ভয় তৈরি করে বা দিনের কাজ ব্যাহত করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

একটি সহজ নোট রাখতে পারেন:

  • কখন ঘুমালেন
  • কতবার ঘুম ভাঙল
  • দুঃস্বপ্ন হয়েছিল কি না
  • আগের দিন বড় কোনো ভয়, ঝগড়া বা মানসিক চাপ ছিল কি না
  • চা-কফি বা উত্তেজক পানীয় কত রাতে খেয়েছেন
  • নতুন কোনো ওষুধ শুরু হয়েছে কি না

এ ধরনের নোট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সময়ও কাজে লাগতে পারে।

দুঃস্বপ্নের কারণে নিয়মিত ঘুম নষ্ট হলে, সপ্তাহে বারবার হলে বা দিনের কাজ, পড়াশোনা ও মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেললে চিকিৎসক বা মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

৫. ঘুমের মধ্যে শরীর নড়াতে না পারা কী?

অনেক মানুষ এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেন:

চোখ খুলেছে বা আশপাশ সম্পর্কে কিছুটা সচেতন, কিন্তু শরীর নড়ছে না। কথা বলতে পারছেন না। বুকের ওপর চাপ মনে হচ্ছে। কখনো মনে হয় ঘরে কেউ আছে। ভয় এত তীব্র হয় যে অভিজ্ঞতাটি অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে স্লিপ প্যারালাইসিস বলা হয়। অর্থাৎ ঘুমিয়ে পড়া বা ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময় সাময়িকভাবে নড়তে বা কথা বলতে না পারা।

এ সময় তীব্র ভয় বা স্বপ্নসদৃশ অনুভূতি হতে পারে; কারও কাছে ঘরে উপস্থিতি আছে বলে মনে হতে পারে বা বুকের ওপর চাপের অনুভূতিও হতে পারে।

অভিজ্ঞতাটি খুব ভয়ংকর লাগতে পারে। ঘুমের ঘাটতি, অনিয়মিত ঘুম এবং কিছু মানসিক-স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

সূত্র: World Health Organization, Technical Meeting on Sleep and Health, sleep paralysis section; Md. Yeasin et al., Jagannath University Journal of Science, 2024, “Sleep Paralysis as Predicted by Adverse Childhood Experiences: The Mediating Role of Depression”।

তাই:

“নড়তে পারিনি, তাই জিন চেপেছিল”

এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে দেওয়া নিরাপদ নয়।

৬. স্লিপ প্যারালাইসিস হলে তখন কী করবেন?

অভিজ্ঞতার সময় সম্ভব হলে নিজেকে মনে করিয়ে দিন:

“আমি জেগে উঠছি, কিন্তু শরীর পুরোপুরি জাগেনি। এটি কেটে যাবে।”

তারপর:

  • আতঙ্কে কারণ নির্ধারণের চেষ্টা করবেন না।
  • সম্ভব হলে ছোট কোনো অঙ্গ, যেমন আঙুল বা পায়ের আঙুল নড়ানোর চেষ্টা করুন।
  • শ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন।
  • আল্লাহর যিকর বা পরিচিত দোয়া মনে মনে পড়তে পারেন।
  • পুরোপুরি জেগে গেলে বসুন, পানি খান এবং নিজেকে স্থির করুন।

যদি এটি বারবার হয়, ঘুমাতে ভয় লাগে বা সারাদিন অতিরিক্ত ঘুম পায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৭. রাতে হঠাৎ ভয়, বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট হলে কী বুঝবেন?

কখনো ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে তীব্র ভয়, বুক ধড়ফড়, ঘাম, কাঁপুনি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এটি প্যানিকের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। আবার কিছু শারীরিক সমস্যাও এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

তাই রাতের ঘটনা বলে সরাসরি জিনের দিকে যাবেন না।

বিশেষ করে যদি নতুন বা তীব্র বুকব্যথা, গুরুতর শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হওয়া বা অন্য জরুরি শারীরিক লক্ষণ থাকে, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান বা জরুরি চিকিৎসা নিন।

প্যানিক ও জরুরি লক্ষণ নিয়ে আগের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

৮. ঘুম না আসা বা বারবার ঘুম ভাঙা কি আধ্যাত্মিক সমস্যা?

সবসময় নয়।

অনিদ্রা বলতে ঘুমানোর সুযোগ ও পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও ঘুমাতে সমস্যা, বারবার জেগে ওঠা বা ভালো মানের ঘুম না হওয়াকে বোঝানো হয়।

ঘুমের সমস্যা বাড়তে পারে:

  • মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তায়
  • অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচিতে
  • রাতে অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহারে
  • বিকেল বা রাতে বেশি ক্যাফেইনে
  • দিনের দীর্ঘ ঘুমে
  • কিছু ওষুধ বা শারীরিক সমস্যায়

কখনো ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত ভয়ও ঘুমের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। “আজও ঘুম হবে না” এই চিন্তা নিজেই একটি চক্র তৈরি করতে পারে।

ঘুমের অসুবিধা দীর্ঘদিন থাকলে এবং দিনের কাজ ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: Md. Faruk Hossain, “An overview of insomnia and its treatment”, Archives of NIMH, Bangladesh, 2020; 3(2):03-09।

৯. ঘুমের সময় জোরে নাক ডাকা বা শ্বাস বন্ধ হওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সব রাতের অস্বস্তি মানসিক বা আধ্যাত্মিক নয়। কিছু মানুষের ঘুমের মধ্যে শ্বাস বারবার বন্ধ বা খুব কমে যেতে পারে। একে স্লিপ অ্যাপনিয়া, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে শ্বাসের বারবার বাধা, বলা হয়।

যে লক্ষণগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার:

  • খুব জোরে নাক ডাকা
  • ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আবার হাঁসফাঁস করে ওঠা
  • রাতে বারবার জেগে ওঠা
  • সকালে সতেজ না লাগা
  • দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া

এগুলো থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রয়োজন হলে ঘুমের পরীক্ষা করা হয়।

সূত্র: World Health Organization, Diagnostic and Management Guidelines for Mental Disorders in Primary Care, “Sleep problems (insomnia)” section, sleep apnoea note।

“রাতে কিছু চেপে ধরছে” মনে হওয়ার পেছনেও কখনো শ্বাস-সংক্রান্ত ঘুমের সমস্যা থাকতে পারে। তাই সম্ভাব্য শারীরিক কারণ দেখা জরুরি।

১০. ঘুমের আগে সুন্নাহসম্মত হেফাজতের আমল

ঘুমের আগে কিছু প্রমাণিত আমল রয়েছে। এগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট রোগের গোপন চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ সুন্নাহ ও হেফাজতের আমল হিসেবে গ্রহণ করুন।

  • ওযু করে শোয়া এবং ডান কাতে শোয়া।

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৪৭।

  • আয়াতুল কুরসি পড়া।

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৩১১।

  • সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে হাত বুলানো, তিনবার।

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৭।

  • রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া।

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০০৯।

ঘুমের অন্যান্য মাসনুন দোয়া ও আমল অধ্যায় ২০-এ বিস্তারিত আসবে।

এখানে একটি কথা মনে রাখুন: এসব আমল করার পরও কোনো রাতে দুঃস্বপ্ন হলে ধরে নেবেন না যে আমল “কাজ করেনি”। ইবাদতের মূল্য শুধু তাৎক্ষণিক অনুভূতি দিয়ে মাপা যায় না।

১১. ঘুম ঠিক করার কিছু বাস্তব অভ্যাস

রুকইয়াহ ও যিকরের পাশাপাশি ঘুমের সাধারণ কারণগুলোও ঠিক করা দরকার।

চেষ্টা করুন:

  • প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে ও উঠতে।
  • ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা উজ্জ্বল স্ক্রিনে না থাকতে।
  • সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি কমাতে।
  • দিনের খুব দীর্ঘ ঘুম এড়িয়ে চলতে।
  • শোবার ঘর যতটা সম্ভব শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখতে।
  • দিনের মানসিক চাপ ও অসমাপ্ত কাজ বিছানায় নিয়ে না যেতে।

ঘুমের অভ্যাস ঠিক করা অনিদ্রা ব্যবস্থাপনার মৌলিক অংশ।

সূত্র: Archives of NIMH, Bangladesh, 2020; 3(2):03-09; World Health Organization, “Stress” Q&A, sleep-hygiene recommendations।

১২. স্বপ্নের ব্যাখ্যার পেছনে অতিরিক্ত ছুটবেন না

দুঃস্বপ্নের পর অনেকে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটে স্বপ্নের ব্যাখ্যা খোঁজেন। কেউ বলেন, “এই স্বপ্ন মানে জাদু।” কেউ বলেন, “এই মানুষটিই আপনার শত্রু।”

এ ধরনের নিশ্চিত ব্যাখ্যা ভয় বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে:

  • কাউকে সন্দেহ করবেন না
  • সম্পর্ক ভাঙবেন না
  • চিকিৎসা বন্ধ করবেন না
  • নিজের ওপর “জিন/জাদু”র লেবেল দেবেন না

দুঃস্বপ্নের জন্য সুন্নাহর করণীয় পালন করুন এবং স্বপ্নটিকে নিজের পুরো বাস্তবতার কেন্দ্র বানাবেন না।

১৩. কখন চিকিৎসক বা ঘুম-বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

নিচের যেকোনোটি থাকলে পেশাদার মূল্যায়ন উপকারী হতে পারে:

  • কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছে
  • ঘুমের সমস্যা দিনের কাজ, পড়াশোনা বা নিরাপত্তা ব্যাহত করছে
  • বারবার স্লিপ প্যারালাইসিস হচ্ছে এবং ঘুমাতে ভয় লাগছে
  • সপ্তাহে বারবার দুঃস্বপ্ন হচ্ছে
  • ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হওয়া বা হাঁসফাঁস হচ্ছে
  • দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুম পাচ্ছে
  • ঘুমের মধ্যে নিজের বা অন্যের আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে
  • নতুন ওষুধ শুরু করার পর দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের বড় পরিবর্তন হয়েছে

ওষুধের কারণে সমস্যা সন্দেহ হলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করবেন না; যিনি ওষুধ দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে কথা বলুন।

১৪. একটি সহজ রাতের পরিকল্পনা

১. ঘুমের সময় মোটামুটি নির্দিষ্ট রাখুন।

২. ওযু করে ডান কাতে শোয়ার চেষ্টা করুন।

৩. প্রমাণিত ঘুমের আমলগুলো পড়ুন।

৪. ঘুমের আগে ভয় বাড়ায় এমন ভিডিও, গল্প ও লক্ষণ-তালিকা এড়িয়ে চলুন।

৫. দুঃস্বপ্ন হলে সুন্নাহর করণীয় পালন করুন, ব্যাখ্যার পেছনে ছুটবেন না।

৬. স্লিপ প্যারালাইসিস হলে আতঙ্কিত না হয়ে এটি কেটে যাওয়ার অপেক্ষা করুন এবং বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৭. ঘুমের সমস্যা দীর্ঘ হলে আধ্যাত্মিক আমলের পাশাপাশি বাস্তব ও চিকিৎসাগত কারণও দেখুন।

মনে রাখুন

  • সব স্বপ্ন একই ধরনের নয়।
  • দুঃস্বপ্নের জন্য সুন্নাহ নির্দিষ্ট করণীয় শিখিয়েছে।
  • দুঃস্বপ্ন, ঘুম ভাঙা বা স্লিপ প্যারালাইসিস একা জিন বা সিহরের নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
  • স্লিপ প্যারালাইসিসে উপস্থিতি বা বুকের চাপ অনুভব হওয়া পরিচিত অভিজ্ঞতা হতে পারে।
  • বারবার দুঃস্বপ্ন বা দীর্ঘ অনিদ্রার শারীরিক ও মানসিক কারণও দেখা দরকার।
  • ঘুমের আগে মাসনুন আমল এবং ভালো ঘুমের অভ্যাস, দুইটিই উপকারী।

একটি বাক্য মনে রাখুন:

রাতের ভয়কে অস্বীকার করবেন না, আবার রাতের প্রতিটি অস্বস্তিকে অদৃশ্য কারণের প্রমাণও বানাবেন না।

পরের অধ্যায়ে

ঘুমের সমস্যার পর আমরা এমন কিছু শারীরিক কষ্ট নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো দীর্ঘদিন থাকে, বারবার ফিরে আসে বা পরীক্ষায় সহজে কারণ ধরা পড়ে না।

কখন রুকইয়াহ করবেন? কখন চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন? আর “কারণ পাওয়া যায়নি” মানেই কি জিন বা জাদু?

পরের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব:

অধ্যায় ১১: শারীরিক ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ ও কারণ-অস্পষ্ট অসুস্থতা

শারীরিক ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ ও কারণ-অস্পষ্ট অসুস্থতা

এখন কী করবেন?

ঘুমের সময়, জাগার সময় এবং দুঃস্বপ্ন বা অস্বস্তির ঘটনা সংক্ষেপে নোট করুন। পরিচিত ঘুমের মাসনুন আমল পড়ুন। সমস্যা বারবার হলে ঘুম ও স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন নিন।

তথ্যসূত্র

১. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৭০৪৪।

২. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬১a, ২২৬১f, ২২৬২ ও ২২৬৩a (Sunnah.com numbering)।

৩. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৪৭।

৪. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৩১১।

৫. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৭।

৬. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০০৯।

৭. World Health Organization, Post-traumatic stress disorder; WHO ICD classification, F51.5 Nightmares।

৮. World Health Organization, Technical Meeting on Sleep and Health, sleep paralysis section; Md. Yeasin et al., Jagannath University Journal of Science, 2024, “Sleep Paralysis as Predicted by Adverse Childhood Experiences: The Mediating Role of Depression”।

৯. Md. Faruk Hossain, “An overview of insomnia and its treatment”, Archives of NIMH, Bangladesh, 2020; 3(2):03-09।

১০. World Health Organization, Diagnostic and Management Guidelines for Mental Disorders in Primary Care, “Sleep problems (insomnia)” section, sleep apnoea note; World Health Organization, “Stress” Q&A।

পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?

রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।

পরামর্শ বুক করুন
বইয়ের সূচিতে ফিরুন