মূল বিষয়বস্তুতে যান

নুরুল কালাম একাডেমিতে আপনাকে স্বাগতম

০১৫৭৭৩০১১৬১

দ্বিতীয় ভাগ · সমস্যা ও উদ্বেগ বুঝুন

অধ্যায় ১২

শিশু ও পরিবারের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ, সুরক্ষা ও সতর্কতা

শিশু ও পরিবারের ক্ষেত্রে ভয় না বাড়িয়ে safeguarding, guardian involvement ও নিরাপদ আমল।

১৫টি প্রশ্নপ্রায় ৯ মিনিটের পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

একটি শিশু রাতে বারবার কাঁদছে। আরেকটি হঠাৎ ভয় পাচ্ছে। কারও জ্বর, কারও ঘুমের সমস্যা, কারও আচরণ বদলেছে। পরিবারে কেউ বললেন, “নজর লেগেছে।” আরেকজন বললেন, “জিনের সমস্যা।” তারপর শিশুটিকে ভয় দেখানো শুরু হলো, এক রাকি থেকে আরেক রাকির কাছে নেওয়া হলো, কখনো চিকিৎসাও দেরি হলো।

শিশুদের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতি বড় হতে পারে। কারণ একটি শিশু নিজের কষ্ট সবসময় পরিষ্কারভাবে বলতে পারে না। সে বড়দের কথাও সহজে বিশ্বাস করে। তাই তাকে যদি বারবার বলা হয়, “তোমার ভেতরে জিন আছে” বা “তোমার ওপর জাদু করা হয়েছে”, সেই ভয় তার মনে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।

এই অধ্যায়ের মূল কথা:

শিশুর জন্য রুকইয়াহ করা বৈধ।

শিশুর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক স্বস্তি আগে রক্ষা করতে হবে।

আর কোনো সাধারণ শিশু-সমস্যাকে একা জিন, সিহর বা বদনজরের নিশ্চিত প্রমাণ বানানো যাবে না।

১. শিশুদের জন্য রুকইয়াহ ও হেফাজতের দোয়া কি সুন্নাহতে আছে?

হ্যাঁ।

ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন এবং বলতেন:

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

অর্থ: “আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাই প্রত্যেক শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর নজর থেকে।”

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৩৩৭১।

নবী ﷺ আরও বলেছেন, ইবরাহিম (আ.) ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.)-এর জন্যও এই দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় চাইতেন।

এটি পরিবারকে একটি সুন্দর শিক্ষা দেয়: সন্তানের হেফাজতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা সুন্নাহসম্মত আমল।

২. বাবা-মা কি নিজেরাই সন্তানের রুকইয়াহ করতে পারেন?

অবশ্যই পারেন।

সন্তানের জন্য দোয়া করতে বা কুরআন পড়ে রুকইয়াহ করতে সবসময় আলাদা কোনো রাকি দরকার নেই। বাবা-মা বা দায়িত্বশীল অভিভাবক নিজেরাই প্রামাণিক কুরআন ও দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে শিফা ও হেফাজত চাইতে পারেন।

সহজভাবে:

  • সূরা আল-ফাতিহা পড়তে পারেন। রুকইয়াহ হিসেবে এর প্রমাণ অধ্যায় ২-এ আলোচনা হয়েছে।
  • সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস পড়তে পারেন। এগুলো পড়ে ফুঁ ও শরীরে হাত বুলানোর সুন্নাহ অধ্যায় ১০-এ উল্লেখ হয়েছে।
  • সন্তানের হেফাজতের জন্য সহিহ আল-বুখারি ৩৩৭১-এর দোয়া পড়তে পারেন।
  • অসুস্থ হলে প্রামাণিক শিফার দোয়াগুলো পড়তে পারেন।
  • হালকা ফুঁ দিতে পারেন এবং স্নেহের সঙ্গে শিশুর মাথা বা শরীরে হাত রাখতে পারেন, যদি এতে তার অস্বস্তি না হয়।

রুকইয়াহর মূল পরিবেশ হওয়া উচিত শান্ত, স্বাভাবিক এবং নিরাপদ।

৩. শিশুদের বদনজর লাগতে পারে কি?

বদনজরের বাস্তবতা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত, এবং শিশুদের ক্ষেত্রেও রুকইয়াহর নির্দেশ এসেছে।

উম্মু সালামা (রা.)-এর ঘরে একটি মেয়েশিশুর মুখে একটি চিহ্ন দেখে নবী ﷺ বলেছিলেন:

“তার জন্য রুকইয়াহ করো, কারণ তার ওপর নজরের প্রভাব আছে।”

সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৩৯।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুর ক্ষেত্রে বদনজরের জন্য রুকইয়াহ করা বৈধ।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা আছে। এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি নবী ﷺ-এর পর্যবেক্ষণ। এখান থেকে এমন কোনো নিয়ম তৈরি করা যাবে না যে শিশুর মুখে দাগ, জ্বর, কান্না, দুর্বলতা বা আচরণ পরিবর্তন দেখলেই “নজর নিশ্চিত” বলা যাবে।

৪. কোন কোন শিশু-সমস্যাকে দ্রুত জিন বা নজর বলা ঠিক নয়?

শিশুদের মধ্যে খুব সাধারণভাবে দেখা যেতে পারে:

  • জ্বর বা বারবার অসুস্থ হওয়া
  • রাতে কান্না বা ঘন ঘন জেগে ওঠা
  • খেতে না চাওয়া বা ক্ষুধার পরিবর্তন
  • ভয় পাওয়া বা একা থাকতে না চাওয়া
  • নতুন পরিবেশে আচরণ বদলে যাওয়া
  • অতিরিক্ত রাগ, জেদ বা কান্না
  • বিছানা ভেজানো
  • কথা বলতে দেরি হওয়া
  • পড়াশোনায় মনোযোগের সমস্যা
  • কোনো বড় পরিবর্তন, ভয় বা পারিবারিক চাপের পর আচরণ বদলে যাওয়া

এসবের কোনো একটি বা কয়েকটি থাকলেই জিন, জাদু বা বদনজর নিশ্চিত নয়। বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, ঘুম, বিকাশ, পরিবার, স্কুল, ভয়, মানসিক চাপ এবং অন্য অনেক কারণ বিবেচনা করতে হয়।

শিশুকে রুকইয়াহ করতে পারেন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা বিকাশগত মূল্যায়নও করবেন।

৫. শিশুর বিকাশে দেরি হলে কী করবেন?

কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী কথা বলা, চলাফেরা, সামাজিক যোগাযোগ বা অন্য দক্ষতায় পিছিয়ে থাকতে পারে। কখনো আগে অর্জিত কোনো দক্ষতাও হারাতে পারে।

এ ধরনের বিষয়কে “জিন করেছে” বলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Developmental Difficulties in Early Childhood: Prevention, Early Identification, Assessment and Intervention গ্রন্থে ভাষা, জ্ঞানীয়, সামাজিক-আবেগিক, আচরণগত ও চলাফেরাসংক্রান্ত বিকাশগত সমস্যার দ্রুত শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন ও হস্তক্ষেপের গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে। WHO ও UNICEF-এর ২ মার্চ ২০২৬-এর thematic brief-এও বিকাশে দেরি বা প্রতিবন্ধিতা থাকা শিশুদের জন্য সমন্বিত ও পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তাই যদি বাবা-মায়ের মনে হয়:

  • কথা বলা উল্লেখযোগ্যভাবে দেরি হচ্ছে
  • আগে বলা শব্দ বা শেখা দক্ষতা হারিয়ে যাচ্ছে
  • চোখে চোখ রাখা বা সামাজিক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন হয়েছে
  • চলাফেরা বা হাতের কাজে বয়স অনুযায়ী বড় সমস্যা আছে
  • আচরণ বা বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ আছে

তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু-বিকাশ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন নিন।

রুকইয়াহ ও দোয়া করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু মূল্যায়ন দেরি করবেন না।

৬. শিশুর জ্বর বা অসুস্থতায় প্রথম কাজ কী?

শিশুর জ্বর, কাশি, বমি, ডায়রিয়া, ব্যথা বা দুর্বলতা হলে প্রথমে তার শারীরিক অবস্থা দেখুন।

শুধু “নজর” ধরে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বাদ দেবেন না।

বিশেষ করে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে যদি শিশু:

  • শ্বাস নিতে কষ্ট করে
  • অস্বাভাবিকভাবে ঝিমিয়ে যায় বা জাগানো কঠিন হয়
  • খিঁচুনি হয়
  • পানি বা বুকের দুধ খেতে না পারে
  • বারবার সবকিছু বমি করে ফেলে
  • অচেতন হয়ে যায়
  • মারাত্মক পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখায়

WHO-এর শিশু-রোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশনায় এ ধরনের লক্ষণকে গুরুতর বিপদের লক্ষণ হিসেবে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে।

এ অবস্থায় আগে শিশুর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করুন। পাশে দোয়া ও রুকইয়াহ পড়া যেতে পারে, কিন্তু চিকিৎসা বিলম্বিত করা যাবে না।

৭. শিশুর খিঁচুনি হলে কী করবেন?

খিঁচুনি দেখলে পরিবার ভয় পেয়ে যেতে পারে। কেউ তখন শিশুকে শক্ত করে ধরে রাখেন, মুখে কিছু ঢোকান বা জোর করে পানি খাওয়ান। এগুলো বিপজ্জনক হতে পারে।

খিঁচুনির সময়:

  • শিশুকে নিরাপদ জায়গায় কাত করে শুইয়ে দিন।
  • আশপাশের শক্ত বা ধারালো জিনিস সরিয়ে দিন।
  • জোর করে ধরে রাখবেন না।
  • মুখে পানি, ওষুধ, চামচ, আঙুল বা কোনো বস্তু ঢোকাবেন না।
  • শ্বাস ঠিক আছে কি না খেয়াল রাখুন।
  • খিঁচুনি কতক্ষণ চলছে সময় লক্ষ্য করুন।
  • প্রথমবার খিঁচুনি হলে, দীর্ঘ হলে, পরপর হলে, শ্বাসকষ্ট থাকলে বা খিঁচুনির পর শিশু জ্ঞান ফিরে না পেলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

WHO-এর Information Kit on Epilepsy-এর first-aid guidance-এও খিঁচুনির সময় ব্যক্তিকে জোর করে ধরে না রাখা এবং মুখে পানি, ওষুধ বা কোনো বস্তু না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রুকইয়াহ পড়তে পারেন, কিন্তু শিশুর শরীর চেপে ধরে বা ঝাঁকিয়ে “জিন বের করার” চেষ্টা করবেন না।

৮. শিশুকে “তোমার ভেতরে জিন আছে” বলা কেন ক্ষতিকর?

একটি শিশু বড়দের কথা আক্ষরিকভাবে নেয়। তাকে বারবার বলা হলে:

“তোমার ভেতরে জিন আছে।”

“তুমি রাতে যা দেখেছ, সেটা জিন।”

“তোমাকে অমুক নজর দিয়েছে।”

তাহলে তার স্বাভাবিক ভয়ও বড় হতে পারে। সে একা ঘুমাতে ভয় পেতে পারে, অন্ধকারকে ভয় করতে পারে, স্কুলে মন বসাতে না পারে, অথবা নিজের শরীর ও চিন্তা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হতে পারে।

তাই শিশুর সামনে ভয়ংকর ভাষা ব্যবহার করবেন না।

বরং বলুন:

“তুমি ভয় পেয়েছ, আমরা আছি।”

“আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন।”

“আমরা দোয়া পড়ব, আর যদি শরীর খারাপ থাকে ডাক্তারকেও দেখাব।”

শিশুকে নিরাপত্তা দিন, পরিচয় নয়।

৯. দুঃস্বপ্ন বা রাতের ভয় হলে কী করবেন?

শিশুর দুঃস্বপ্ন হতে পারে। নতুন স্কুল, ভয়, গল্প, পারিবারিক ঝামেলা, ঘুমের অনিয়ম বা দিনের অভিজ্ঞতাও রাতে প্রভাব ফেলতে পারে।

দুঃস্বপ্নের পর:

  • শিশুকে শান্ত করুন।
  • সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুরু করবেন না।
  • “জিন এসেছে” বলে ভয় বাড়াবেন না।
  • ঘুমের আগে মাসনুন দোয়া ও হেফাজতের আমল পড়তে পারেন।
  • ভয়ংকর ভিডিও, গল্প বা জিন-কেন্দ্রিক আলোচনা শিশুর সামনে কমান।
  • নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখুন।

রাতের সমস্যা দীর্ঘ হলে বা দিনের আচরণে বড় প্রভাব ফেললে শিশু বিশেষজ্ঞ বা উপযুক্ত পেশাজীবীর পরামর্শ নিন।

১০. রুকইয়াহর সময় শিশু কাঁদলে বা অস্থির হলে কী বুঝবেন?

শিশু কাঁদতে পারে কারণ সে ভয় পেয়েছে, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, অপরিচিত মানুষের সামনে অস্বস্তিতে আছে, উচ্চ শব্দ পছন্দ করছে না বা দীর্ঘ সময় বসতে পারছে না।

তাই রুকইয়াহর সময় কান্না, ঘুম, হাই, বিরক্তি বা পালাতে চাওয়া দেখে “জিন বের হচ্ছে” বলা ঠিক নয়।

শিশু অস্বস্তি বোধ করলে রুকইয়াহ ছোট করুন, বিরতি দিন, কোলে নিন বা পরে পড়ুন।

রুকইয়াহ শিশুর জন্য নতুন আতঙ্ক হওয়ার কথা নয়।

১১. শিশুর ওপর রুকইয়াহর নামে যা করা যাবে না

কোনো অবস্থাতেই শিশুকে:

  • মারধর করা
  • গলা বা বুক চেপে ধরা
  • জোর করে বেঁধে রাখা
  • আগুন, গরম বস্তু বা ধোঁয়া দিয়ে কষ্ট দেওয়া
  • জোর করে বমি করানো
  • অজানা পদার্থ খাওয়ানো
  • ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেওয়া
  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা জোরে অডিও শুনতে বাধ্য করা
  • “জিনের সঙ্গে কথা বলছি” বলে তার কথা উপেক্ষা করা

গ্রহণযোগ্য নয়।

শিশুর শরীরের ওপর নির্যাতনকে “জিনকে মারছি” বলে বৈধ করা যায় না।

১২. অন্য কারও কাছে শিশুকে রুকইয়াহ করাতে হলে কী দেখবেন?

সবচেয়ে নিরাপদ হলো, বাবা-মা বা অভিভাবক নিজেরাই সন্তানের জন্য রুকইয়াহ পড়েন। তবু অন্য কারও সাহায্য নিলে কয়েকটি নীতি মানুন:

  • অভিভাবক সবসময় উপস্থিত থাকবেন।
  • শিশুকে একা কোনো রাকির কাছে রাখা হবে না।
  • অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ, কাপড় খোলা বা গোপন পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য নয়।
  • মারধর, বাঁধা, ভয় দেখানো বা ব্যথা দেওয়া যাবে না।
  • অজানা মন্ত্র, তাবিজ বা গোপন বস্তু ব্যবহার করা হবে না।
  • “কাউকে বলবেন না” ধরনের গোপন নির্দেশে সতর্ক হোন।
  • চিকিৎসকের ওষুধ বন্ধ করতে বলা হলে কারণ ও যোগ্যতা যাচাই ছাড়া তা মানবেন না।
  • শিশুর কথা ও অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিন।

শিশুর নিরাপত্তা কোনো রুকইয়াহ সেশনের চেয়ে বড়।

১৩. পরিবারের মধ্যে “কে নজর দিয়েছে?” প্রশ্নটি কীভাবে সামলাবেন?

শিশু অসুস্থ হলে পরিবারে দ্রুত সন্দেহ শুরু হতে পারে:

“ওই আত্মীয় কোলে নেওয়ার পর থেকেই হয়েছে।”

“অমুক খুব প্রশংসা করেছিল।”

“ওর নানাবাড়ি থেকে এসে সমস্যা শুরু হয়েছে।”

এগুলো কাউকে অভিযুক্ত করার যথেষ্ট প্রমাণ নয়।

শিশুকে কেন্দ্র করে যদি মা, শাশুড়ি, আত্মীয় বা প্রতিবেশীকে বদনজরের জন্য দায়ী করা শুরু হয়, তাহলে শিশুর অসুস্থতার সঙ্গে পারিবারিক বিরোধও যোগ হয়।

বরং সন্তানের জন্য দোয়া করুন, প্রয়োজনীয় রুকইয়াহ করুন, চিকিৎসা নিন এবং সন্দেহ ছড়াবেন না।

১৪. পরিবারের দৈনন্দিন হেফাজত কেমন হতে পারে?

পরিবারের হেফাজত শুধু সমস্যার সময় শুরু হবে না। স্বাভাবিক জীবনেই কিছু সহজ আমল রাখা যায়:

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের যত্ন
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকর
  • ঘুমের আগে মাসনুন আমল
  • শিশুদের বয়স অনুযায়ী ছোট ছোট দোয়া শেখানো
  • ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ রাখা
  • ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসার সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা শেখানো

শিশুকে এমনভাবে দ্বীন শেখান যেন আল্লাহর স্মরণ তার কাছে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করে, আতঙ্ক নয়।

১৫. বাবা-মায়ের জন্য একটি সহজ সিদ্ধান্তপথ

শিশুর কোনো সমস্যা দেখলে নিজেকে পাঁচটি প্রশ্ন করুন:

১. শিশুর এখনই চিকিৎসার প্রয়োজন বা বিপদের কোনো লক্ষণ আছে কি?

২. সমস্যাটি তার বয়স, ঘুম, খাবার, অসুস্থতা, স্কুল বা পারিবারিক চাপ দিয়ে ব্যাখ্যা হতে পারে কি?

৩. বিকাশ বা আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আছে কি, যার বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন দরকার?

৪. আমি কি শিশুর সামনে এমন কোনো কথা বলছি, যা তার ভয় বাড়াচ্ছে?

৫. আমি কি শান্তভাবে দোয়া, কুরআন ও রুকইয়াহ করছি, নাকি প্রতিক্রিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছি?

এই প্রশ্নগুলো কারণ নিশ্চিত করবে না। তবে তাড়াহুড়ো কমাবে।

মনে রাখুন

  • শিশুদের জন্য হেফাজতের দোয়া ও রুকইয়াহ সুন্নাহসম্মত; বাবা-মা নিজেরাই সন্তানের জন্য রুকইয়াহ করতে পারেন।
  • শিশুর জ্বর, কান্না, ঘুমের সমস্যা বা আচরণ পরিবর্তন একা জিন, সিহর বা বদনজরের প্রমাণ নয়।
  • বিকাশে দেরি বা দক্ষতা হারালে শিশু-বিকাশ মূল্যায়ন দেরি করবেন না।
  • খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা বা পান করতে না পারার মতো বিপদের লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
  • রুকইয়াহর নামে শিশুকে ভয় দেখানো, মারধর বা নির্যাতন করা যাবে না।
  • শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো রুকইয়াহর পরিবেশ হলো শান্ত, নিরাপদ, স্নেহপূর্ণ এবং আল্লাহমুখী পরিবেশ।

একটি বাক্য মনে রাখুন:

শিশুকে আগে নিরাপত্তা দিন, তারপর ব্যাখ্যা খুঁজুন; ভয় দিয়ে কোনো শিশুর চিকিৎসা বা রুকইয়াহ শুরু করবেন না।

পরের অধ্যায়ে

এ পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন সমস্যা বুঝতে চেষ্টা করেছি। এখন বইয়ের তৃতীয় ভাগ, “নিজের জন্য রুকইয়াহ”-এ প্রবেশ করব।

রুকইয়াহ শুরু করার আগে কী বুঝবেন? কী প্রস্তুতি নেবেন? অদৃশ্য কারণ নিশ্চিত করা কি দরকার? নিজের জন্য রুকইয়াহ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পরের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব:

অধ্যায় ১৩: নিজের জন্য রুকইয়াহ কেন, কখন ও কী প্রস্তুতি নেবেন?

নিজের জন্য রুকইয়াহ কেন, কখন ও কী প্রস্তুতি নেবেন?

এখন কী করবেন?

শিশুর নিরাপত্তা ও উপসর্গ আগে দেখুন। অসুস্থতায় চিকিৎসকের পরামর্শ দেরি করবেন না। শান্তভাবে দোয়া করুন; শিশুকে ভয়, আঘাত বা অজানা পদ্ধতির সামনে ফেলবেন না।

তথ্যসূত্র

১. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৩৩৭১, হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য হেফাজতের দোয়া।

২. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৩৬, সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহ।

৩. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৭, আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস পড়ে ফুঁ ও শরীরে হাত বুলানো।

৪. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৩৯, মেয়েশিশুর জন্য বদনজরের রুকইয়াহর নির্দেশ।

৫. World Health Organization, Developmental difficulties in early childhood: prevention, early identification, assessment and intervention in low- and middle-income countries: a review, ১০ মার্চ ২০১২।

৬. UNICEF ও WHO, Nurturing care for children with developmental delays and disabilities: thematic brief, ২ মার্চ ২০২৬।

৭. World Health Organization, Paediatric Emergency Triage, Assessment and Treatment (ETAT), 2016।

৮. World Health Organization, Integrated Management of Childhood Illness (IMCI), General Danger Signs।

৯. World Health Organization, WHO Information Kit on Epilepsy: What You Can Do, 2015।

পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?

রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।

পরামর্শ বুক করুন
বইয়ের সূচিতে ফিরুন