প্রথম ভাগ · ভিত্তি ও বোঝাপড়া
অধ্যায় ২
রুকইয়াহ আসলে কী?
কুরআনের আয়াত, প্রামাণিক দোয়া ও শিরকমুক্ত বৈধ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা ও হেফাজত চাওয়া।
৯টি প্রশ্নপ্রায় ৫ মিনিটের পড়া
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
“রুকইয়াহ” শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে একটি বিশেষ দৃশ্য ভেসে ওঠে। একজন রাকি বসে আছেন, সামনে একজন অসুস্থ মানুষ, পাশে পানি বা তেল, আর পুরো বিষয়টি যেন জিন, জাদু বা বদনজরকে ঘিরেই।
কিন্তু রুকইয়াহকে শুধু এই দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে বিষয়টির বড় একটি অংশ হারিয়ে যায়।
রুকইয়াহ কোনো রহস্যময় বিদ্যা নয়। কোনো গোপন শক্তিও নয়। সহজভাবে বললে, কুরআনের আয়াত ও বৈধ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা, হেফাজত ও সাহায্য চাওয়াই রুকইয়াহর মূল কথা।
রুকইয়াহর কেন্দ্রবিন্দু কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো রাকি নয়, কোনো বিশেষ পানি বা তেলও নয়। কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র আল্লাহ।
১. সহজ ভাষায় রুকইয়াহ
রুকইয়াহ হলো আল্লাহর কালাম ও বৈধ দোয়া পড়ে তাঁর কাছেই আরোগ্য, সুরক্ষা ও কল্যাণ চাওয়া।
এখানে দুটি কথা শুরুতেই মনে রাখা দরকার।
প্রথমত, রুকইয়াহ একটি বৈধ শরঈ উপায়।
দ্বিতীয়ত, রুকইয়াহ নিজে শিফা দেয় না। শিফা দেন আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
“আমি কুরআনের এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।”কুরআন মুমিনের জন্য শিফা ও রহমত। তবে এখান থেকে নিজের মতো করে কোনো নির্দিষ্ট আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নির্দিষ্ট প্রেসক্রিপশন বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। যেখানে নির্দিষ্ট পদ্ধতি, দোয়া বা সংখ্যা সহিহ সুন্নাহতে এসেছে, সেখানে আমরা তা সেভাবেই বলব। আর যেখানে এমন নির্দিষ্ট দলিল নেই, সেখানে বাড়তি দাবি করব না।
২. রুকইয়াহ কি ইসলামে প্রমাণিত?
হ্যাঁ। রুকইয়াহ ইসলামে প্রমাণিত একটি বৈধ আমল।
আউফ ইবন মালিক আল-আশজা‘ঈ (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহিলি যুগে তাঁরা কিছু রুকইয়াহ করতেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি তাঁদের রুকইয়াহগুলো পেশ করতে বলেন এবং বলেন:
“রুকইয়াহতে কোনো অসুবিধা নেই, যতক্ষণ তাতে শিরক না থাকে।”
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০০।
এই হাদিস দুটি বিষয় পরিষ্কার করে। রুকইয়াহ বৈধ, কিন্তু তার সীমা আছে। রুকইয়াহর নামে শিরক বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর এমন নির্ভরতা তৈরি করা যাবে না, যা তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রুকইয়াহর শরঈ শর্ত ও সীমা আমরা পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
৩. কুরআন দিয়ে রুকইয়াহর সরাসরি উদাহরণ
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনায় সাহাবিদের একটি দল সফরে ছিলেন। একটি গোত্রের প্রধান বিচ্ছুর দংশনে আক্রান্ত হন। তখন একজন সাহাবি সূরা আল-ফাতিহা পড়ে তাঁর ওপর রুকইয়াহ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জানানো হলে তিনি তা অনুমোদন করেন।
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৩৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০১।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কুরআন দিয়ে রুকইয়াহ করা প্রমাণিত এবং সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহরও সরাসরি দলিল আছে।
৪. রুকইয়াহ কী নয়
রুকইয়াহ কী, তা বোঝার জন্য রুকইয়াহ কী নয়, সেটাও জানা দরকার।
রুকইয়াহ কোনো গোপন জাদুবিদ্যা নয়।
রুকইয়াহ এমন কোনো মন্ত্র নয়, যার অর্থ কেউ জানে না।
রুকইয়াহ গায়েব জানার পদ্ধতি নয়।
রুকইয়াহ দিয়ে “কে জাদু করেছে” নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়ার ক্ষমতা কেউ পায় না।
রুকইয়াহ কোনো নিশ্চিত ফলের ব্যবসায়িক গ্যারান্টিও নয়।
রুকইয়াহর সময় কারও কাঁপুনি, কান্না, হাই বা অন্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেই সেটিকে নির্দিষ্ট অদৃশ্য সমস্যার নিশ্চিত প্রমাণ ধরা যাবে না।
আর কোনো পদ্ধতি খুব প্রচলিত হলেই সেটি সুন্নাহ হয়ে যায় না।
এখানে একটি নীতি মনে রাখা জরুরি। যা কুরআন বা সহিহ সুন্নাহতে প্রমাণিত, তাকে আমরা প্রমাণিত বলব। যা আলেমদের ব্যাখ্যা, তাকে আলেমদের ব্যাখ্যা বলব। যা অভিজ্ঞতাভিত্তিক বৈধ প্রয়োগ, তাকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক বলব। আর যার শক্ত প্রমাণ নেই, সেটিকে প্রমাণিত সুন্নাহ বলে উপস্থাপন করব না।
৫. রুকইয়াহ শুধু জিন, জাদু বা বদনজরের জন্য নয়
আমাদের সমাজে রুকইয়াহ শব্দটি এত বেশি জিন, জাদু ও বদনজরের সঙ্গে যুক্ত যে অনেকের মনে হয়, এসবের কোনো সন্দেহ না থাকলে রুকইয়াহর প্রয়োজন নেই।
কিন্তু সুন্নাহর চিত্র আরও বিস্তৃত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস পড়ে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন। অসুস্থতা বেড়ে গেলে আয়িশা (রা.) তাঁর ওপর পড়ে তাঁর হাত দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতেন।
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৬।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্য নিজেই পড়েছেন। অর্থাৎ নিজের জন্য রুকইয়াহ করা সুন্নাহতে সরাসরি প্রমাণিত।
এ কারণে একজন মুসলিমের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত, আল্লাহর কাছে নিজে দোয়া করা, কুরআন পড়া এবং নিজের জন্য বৈধভাবে রুকইয়াহ করতে শেখা।
৬. শিফা কার হাতে?
রুকইয়াহ বুঝতে গেলে এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে পরিষ্কার হওয়া দরকার:
শিফা কার হাতে?
উত্তর: একমাত্র আল্লাহর হাতে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
অর্থ: “হে মানুষের রব, কষ্ট দূর করুন। শিফা দিন, আপনিই শিফাদাতা। আপনার শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই। এমন শিফা দিন, যা কোনো অসুস্থতা অবশিষ্ট রাখে না।”
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯১।
এই দোয়া রুকইয়াহর একটি মৌলিক বিশ্বাস স্পষ্ট করে দেয়। কুরআন পড়া হবে, দোয়া করা হবে, চিকিৎসাও নেওয়া হতে পারে, কিন্তু অন্তর জানবে, আরোগ্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
৭. রুকইয়াহ কি চিকিৎসার বিকল্প?
না।
রুকইয়াহ একটি শরঈ আমল ও বৈধ উপায়। চিকিৎসাও বৈধ উপায়। প্রয়োজন হলে দুটো পাশাপাশি চলতে পারে।
কেউ কুরআন পড়ছেন বলেই চিকিৎসকের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। আবার কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেই কুরআন, দোয়া বা রুকইয়াহ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না।
রুকইয়াহর নামে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করা বা চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।
৮. নিজের জন্য নিজে রুকইয়াহ
রুকইয়াহ মানেই একজন বিশেষ ব্যক্তির কাছে যেতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্য নিজে পড়েছেন। আবার সাহাবিরা অন্যের জন্যও রুকইয়াহ করেছেন। অর্থাৎ একজন মুসলিম নিজের জন্য পড়তে পারেন, পরিবারের কেউ পরিবারের জন্য পড়তে পারেন এবং প্রয়োজন হলে অন্য কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিও রুকইয়াহ করতে পারেন।
তবে একজন মুসলিম যেন শুরু থেকেই এমন মনে না করেন যে আল্লাহর কাছে শিফা চাইতে একজন রাকি অপরিহার্য।
আল্লাহ আপনার দোয়াও শোনেন। আপনি কুরআন পড়তে পারেন। আপনি তাঁর কাছে সরাসরি শিফা চাইতে পারেন।
এই উপলব্ধি ভয় কমায় এবং অযথা নির্ভরশীলতা থেকেও রক্ষা করে।
৯. রুকইয়াহর প্রকৃত উদ্দেশ্য
রুকইয়াহর উদ্দেশ্য শুধু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা নয়।
কেউ কাঁপলেন কি না, কেউ চিৎকার করলেন কি না, কে জাদু করেছে তা জানা গেল কি না, এসবকে কেন্দ্র করে রুকইয়াহ করলে মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যেতে পারে।
রুকইয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, শিফা চাওয়া, হেফাজত চাওয়া এবং তাঁর কালামের মাধ্যমে তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া।
ফল কী হবে, কত দিনে হবে, কী অনুভূতি হবে, সবকিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়। আমাদের কাজ বৈধ পথ অনুসরণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
মূল কথা
- রুকইয়াহ একটি প্রমাণিত শরঈ আমল।
- শিফা দেন একমাত্র আল্লাহ।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্য রুকইয়াহ করেছেন, আবার সাহাবিরা অন্যের জন্যও করেছেন।
- রুকইয়াহ চিকিৎসার প্রতিপক্ষ নয়।
- প্রমাণ, আলেমের ব্যাখ্যা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রয়োগকে আলাদা করে বুঝতে হবে।
রুকইয়াহ যতটা রহস্যময় করে উপস্থাপন করা হয়, আসলে ততটা রহস্যময় নয়। এটি কুরআন, দোয়া, তাওয়াক্কুল এবং বৈধ উপায় গ্রহণের একটি সহজ ও সুন্দর সমন্বয়।
এখন কী করবেন?
নিজের জানা একটি সূরা বা দোয়া বেছে নিন। পাঠের উৎস জেনে নিন এবং শিফা আল্লাহর কাছে চান। অন্যের সাহায্য লাগলে কী সাহায্য প্রয়োজন, সেটি পরিষ্কার করুন।
পরের অধ্যায়ে
এখন প্রশ্ন আসে, কোনো রুকইয়াহ শরিয়তসম্মত হওয়ার জন্য কী কী মৌলিক নীতি মানতে হবে? কোন ধরনের শব্দ বা দোয়া ব্যবহার করা যাবে? কোথায় শিরকের আশঙ্কা তৈরি হয়? কোন পদ্ধতিকে “সুন্নাহ” বলা যাবে, আর কোনটিকে শুধু বৈধ বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক বলা উচিত?
পরের অধ্যায়ে আমরা এই বিষয়গুলো গুছিয়ে আলোচনা করব:
অধ্যায় ৩: শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর মৌলিক নীতি
শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর মৌলিক নীতিপর্যালোচনা করেছেন: Emad, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?
রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।